ব্রেকিং নিউজ

x


‘এখানে চিকিৎসা নাই, প্রাইভেট ক্লিনিকে চলেন’-হাজীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দালালদের দৌরাত্ম্য

রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২ | ৭:৪৭ পূর্বাহ্ণ

‘এখানে চিকিৎসা নাই, প্রাইভেট ক্লিনিকে চলেন’-হাজীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দালালদের দৌরাত্ম্য

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. গোলাম মাওলা নঈম বলেন, কোন ভাবেই দালালদের দৌরাত্ম্য রোধ করতে পারছিনা

‘এখানে চিকিৎসা নাই, প্রাইভেট ক্লিনিকে চলেন। কম খরচে ভালো চিকিৎসা পাবেন। হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীকে কথাগুলো বলছিলেন এক দালাল।

হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওয়ার্ডবয় ও দালালের দৌরাত্ম্যে নাজেহাল রোগী ও স্বজনরা। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদেরকে নানা কৌশলে প্রাইভেট ক্লিনিকে বাগিয়ে নিচ্ছে দালালচক্র।

সরেজমিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেখা গেছে, জরুরি বিভাগ, কর্মরত ডাক্তারদের কক্ষ ও মূল গেটের সামনে দালাল ও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের জটলা। মাস্ক ও গ্লাভস পরে দাঁড়িয়ে থাকা দালালরা হাসপাতালে আসা রোগীদের বাগিয়ে নিচ্ছেন প্রাইভেট ক্লিনিকে।

জরুরি বিভাগের ভেতরে দেখা গেছে ৪-৫ জন যুবককে। জরুরি বিভাগে রোগী ও স্বজনরা যাওয়া মাত্রই এই যুবকদের তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। রোগীর স্বজনদের পেছনে ঘুরতে থাকেন তারা। তার কী রোগ, কী করবে তা জানার পরপরই সুযোগ বুঝে স্বজনদের বাগিয়ে নিতে চেষ্টা করে। স্বজনদের বলেন, ‘ক্লিনিকে ভালো চিকিৎসা হবে। আমাদের প্রাইভেট স্যার ভালো করে দেখবেন। এখানে চিকিৎসা হয় না।

শিশু সন্তানকে চিকিৎসার জন্য তাসলিমা নামের একজন নারী হাসপাতালের বর্হিবিভাগ থেকে টিকেট নিয়ে হাসপাতালের ১১৫ নাম্বার রুমের সামলে সিরিয়ালে দাড়ায়। এসম দু’জন বোরকা পরিহিত নারী এসে রোগী সম্পর্কে জানার পর তাকে বারবার প্রাইভেট হাসপাতালে রোগী নিয়ে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেন। আর রোগীকে তাদের হাসপাতালে নিয়ে ডাক্তারের ৪০০ টাকা ভিজিট দাবি করেন। তবে, তাসলিমা এই দালালের কথায় রাজি হননি। এতে ক্ষেপে যান ওই দালাল চক্র।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এই দালাল চক্রটি হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাত্র ১০০ মিটারের মধ্যে অবস্থিত আলীগঞ্জ মা জেনারেল হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের। এ ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের ২/৩ জন মহিলা দালাল চক্র এমনকি ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের ম্যানেজার নিজে এসে হাসপাতালের রোগীদের ভাগিয়ে নিতে দেখা যায়।

এই হাসপাতালের ১০০ মিটারের সামনেই রয়েছে বেশ কয়েকটি ডাগায়নষ্টিক সেন্টার। এ ডায়াগনষ্টিক সেন্টারগুলোর দালালরা জরুরি বিভাগের সামনে, কর্মরত ডাক্তাদের চেম্বারের সামনে এমনকি হাসপাতালের প্রবেশের পথে সার্বক্ষণিক দাড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এমনকি এ দালাল চক্র গুলো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেকের আশ-পাশেরই লোক। তাই তাদের বিরুদ্ধে কেউই কোন কথা বলছে না।

গত ২৮ জুন মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. গোলাম মাওলা নঈম দালাল চক্রকে ধরতে এবং হাসপাতালের দু এজন ওয়ার্ড বল দালালের কাজে জড়িতদের হাতে নাতে ধরার জন্য আলীগঞ্জ মা জেনারেল হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে বেশ কিছু অভিযোগের সত্যতা পান। পরে আলীগঞ্জ মা জেনারেল হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিককে প্রথম বারের মতো সর্তক করেন। পরবর্তীতে এমন অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ৬নং বড়কুল ইউনিয়নের রায়চোঁ গ্রামের মোবারক হোসেন বলেন, কৃষি কাজ করতে গিয়ে কোমরে আঘাত পেয়েছেন। পরে ডাক্তার দেখানোর জন্য টিকেট নিয়ে লাইনে দাড়ানো মাত্রই একজন ভদ্রলোক এসে বলে চাচা লাইনে কেন দাড়ালেন, ডাক্তারতো নেই, ডাক্তার এখন প্রাইভেট চেম্বারে আছে, চলেন সেখানে দেখিয়ে দিবো, ভিজিট ৪০০ টাকা, অন্য কোন খরচ লাগবে না। পরে কৃষক মোবারক বললেন বাবা আমার কাছে তো ২০ টাকার বেশি নেই। ঐ দালাল তখন একটা গালি দিয়ে চলে যায় বলে তিনি জানান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক ডাক্তার জানান, দালালদের উৎপাতে চিকিৎসাসেবা কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালের অভ্যন্তরে অনেক সময় বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কাজ করে এমন ছেলে-মেয়েদের দেখা যায়। ক্লিনিকের দালালদের দৌরাত্ম্য চরম আকার ধারণ করেছে। আমরা কয়েকবার এর সমাধান করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু ক্লিনিক দালালদের কোনোভাবে দমানো যায় না। তিনি আরো বলেন, দালালরা এসে চোখাচোখি হলে তারা সালাম দিয়ে কেটে পড়ে।

হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার গোলাম মাওলা নঈম বলেন, কোন ভাবেই দালালদের দৌরাত্ম্য রোধ করতে পারছিনা। উপজেলা আইনশৃংখলা সভায় ও নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সহযোগিতা চাইবো। হাসপাতালের ভিতরে ওষুধ কোম্পানির লোকদের দুপুর ১টার পূর্বে চেম্বারে প্রবেশ নিষেধ করা হয়েছে। শুধু সরকারি হাসপাতাল নয়, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকেও একই অবস্থা, এটা দুঃখজনক।

তিনি আরো বলেন, ‘হাসপাতালে দালালের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ রয়েছে বেশ। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালদের প্রবেশ নিষেধ করবো এবং প্রাথমিক ভাবে সবাইকে ডেকে সর্তক করা হবে। তবে দালাল নির্মূল করা আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়। সমাজের সকল স্তরের সবাই এগিয়ে আসলে এবং আগত রোগী সচেতন হলেই তা রোধ করা সম্ভব হবে। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চাঁদপুর জেলা সিভিল সার্জন ডাক্তার মো. শাহাদাত হোসেন জানান, হাজীগঞ্জসহ জেলার সকল সরকারি হাসপাতাল থেকে দালাল নির্মূলে জেলা প্রশাসকের সমন্বয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ওষুধ বিক্রয় কর্মীদের বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ সময়: ৭:৪৭ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২

protidin-somoy.com |

Development by: webnewsdesign.com